ফেসবুক গ্রুপ ‘রাজশাহীর উদ্যোক্তা’ ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন তরুণ উদ্যোক্তরা

  • 699
    Shares

‘রাজশাহীর উদ্যোক্তা’ গ্রুপের পেছনের কারিগররা। ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিবেদক:

রাজশাহীর মেয়ে তাসনীম আরা। অবসরে ঘরে বসে স্বল্প পরিসরে ‘গিফট কার্ড, বক্স’ অর্থাৎ ‘পেপার ক্রাফট’ ডিজাইন ও সরবরাহের কাজ করে আসছেন তিনি। তবে তার পণ্য সম্পর্কে মানুষকে জানাতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছিল তাসনীম আরার। এজন্য তিনি বেছে নেন সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক। খুলে ফেলেন Surprise your Love নামে ফেসবুক পেজ। সেখানে ভাল সাড়াও পাচ্ছিলেন তিনি।

ধীরে ধীরে তাসনীম আরা‘র পরিচয় হয় তার মতোই আরও অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সাথে। তবে সামাজিক মাধ্যমে রাজশাহীর উদ্যোক্তাদের তেমন কোন প্লাটফরম পাচ্ছিলেন না তারা।

ফলে করোনাকালে ঘরবন্দী থাকা অবস্থায় গত ১৭ জুন ‘রাজশাহীর উদ্যোক্তা’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ খোলেন তিনি। গ্রুপে আরও বেশ ক’জনকে মডারেটর করে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা শুরু করেন তারা।

গ্রুপটি চালুর পর ব্যাপক সাড়া পান তাসনীম আরা ও তার সহযোগীরা। দুই দিনেই গ্রুপে যুক্ত হন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। যাদের অধিকাংশই উদ্যোক্তা। এরপর প্রতিদিনই যুক্ত হতে থাকেন নতুন নতুন উদ্যোক্তা ও ক্রেতারা। অনেক ডেলিভারি ম্যানও এ গ্রুপে যুক্ত হয়ে সুফল ভোগ করছেন।

গতকাল শুক্রবার (১৭) গ্রুপটি খোলার এক মাস পূর্ণ হয়। এই ৩০ দিনের মধ্যেই বেড়েছে গ্রুপটির পরিসর। শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত গ্রুপটিতে যুক্ত হয়েছেন সাড়ে চার হাজার মানুষ। এদের মধ্যে ৮২-৮৫ শতাংশই বিক্রেতা।

‘রাজশাহীর উদ্যোক্তা’ ফেসবুক গ্রুপের স্ক্রিনশট

তবে গ্রুপের অ্যাডমিন তাসনীম আরা জানান, গ্রুপে যুক্তরা এখানে নিজের পণ্যের যেমন প্রচার করে থাকে, তেমনি অন্যের পণ্যের ভোক্তাও। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তা আরেকজনের পণ্য এখান থেকে কিনে থাকে। ফলে এখানে সবাই প্রায় ক্রেতা-বিক্রেতা।

গ্রুপটি খোলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তাসনীম আরা বলেন, ‘রাজশাহীতে অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন। তারা অনেক ভাল ভাল কাজ করে থাকেন। তবে প্রচারের অভাবে তা মানুষ জানতে পারে না। কারণ একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা চাইলেও আর্থিক কারণে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করতে পারেন না। আবার ব্যানার ফেস্টুন দিয়ে প্রচার-প্রচারণাও ব্যয় ও কষ্টসাধ্য।’

‘ফলে রাজশাহীর উদ্যোক্তাদের এক ছাদের নিচে আনার জন্যই আমরা গ্রুপটি চালু করি। এখানে সহজেই যে কেউ নিজের তৈরি ফুড, শাড়ি, ড্রেসসহ যাবতীয় পণ্যের প্রচার করতে পারছে। বেশ ভাল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা প্রত্যেকেই একমাসে উল্লেখ করার মতো টাকার পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন বলেও আমাদের জানিয়েছেন’ যোগ করেন তাসনীম অরা।

তিনি বলেন, ‘গ্রুপে ফুড, হ্যান্ড ক্রাফট, বিভিন্ন ডিজাইনের তৈরি পোশাক বিক্রির জন্য প্রচারের সুযোগ পাচ্ছেন। করোনাকালে অনেকে সুরক্ষা সামগ্রী বিক্রির জন্যও কাজ করছেন। তারা নিজেদের তৈরি ফুড বা পণ্যের গুণাগুণ, মূল্য ও কীভাবে পাওয়া যাবে -এমন তথ্য সম্বলিত পোস্ট দিলে তা এ্যাপ্রুভ করা হয়। তবে পোস্টকারী বা উদ্যোক্তাকে অবশ্যই রাজশাহীর বাসিন্দা হতে হবে। রাজশাহীর বাইরের কারও পোস্ট গ্রুপে এ্যাপ্রুভ করা হয় না।’

গ্রুপে উদ্যোক্তরা বিভিন্ন হেল্প পোস্টও দিয়ে থাকেন

তাসনীম আরও বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য উদ্যোক্তা বা বিক্রেতা নিজেদের পণ্যের সেল পোস্ট করেন আমাদের গ্রুপে। এখানে উদ্যোক্তার ঘর থেকে অর্ডারকৃত পণ্য ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য অনেকে ডেলিভারি ম্যান হিসেবেও কাজ করছেন। তারা দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেন। এখন পর্যন্ত গ্রুপ থেকে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও ডেলিভারির যেসব কাজ হয়েছে, তা নিয়ে কোন অভিযোগ ওঠেনি।’

উদ্যোক্তা ও ক্রেতারা সকলে রাজশাহীর এবং অনেকক্ষেত্রে পরিচিতজন হওয়ায় ঠকবাজি বা খারাপ পণ্য দেওয়ার সুযোগ নেই জানিয়ে তাসনীম আরা বলেন, ‘রাজশাহীর উদ্যোক্তা প্লাটফরম থেকে যারা পণ্য কিনছেন বা কিনবেন, তাদের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। যেহেতু বিক্রেতা ও ক্রেতা দুই পক্ষই রাজশাহীর। ফলে কেউ ভাল পণ্য দেখিয়ে খারাপ পণ্য সরবরাহের মানসিকতা রাখেন না। আর ক্রেতার যদি পণ্য পছন্দ না হয়, তবে দ্রুত এবং সহজে তা ফেরত দিতে পারেন। তাই ঠকে যাওয়ার শঙ্কা একেবারেই নেই।’

রাজশাহীর উদ্যোক্তা গ্রুপের অ্যাডমিন ও মডারেটরবৃন্দ

তিনি আরও বলেন, ‘উদ্যোক্তা, বিক্রেতা বা পন্য উৎপাদনকারী যাই বলেন না কেন, তার থেকে সরাসরি যখন আপনি পণ্য কিনতে পারবেন তখন মূল্য বাজারের তুলনায় অনেক কম পাবেন। রাজশাহীর উদ্যোক্তা গ্রুপে যুক্তরা সরাসরি উৎপাদনকারী অথবা উদ্যোক্তার কাছ থেকে পণ্য কিনতে পারছেন। এতে সবচেয়ে কম দামে পণ্য কিনতে পারছেন তারা। নিকটে হওয়ায় ডেলিভারি চার্জও কম। অনেকক্ষেত্রে সরাসরি উদ্যোক্তার হাত থেকেও পণ্য নেয়ার সুযোগ হচ্ছে।’

তাসনীম আরা জানান, রাজশাহীর উদ্যোক্তা প্লাটফরমে বিভিন্ন পণ্যের রিভিউ দেয়া হয়। ফলে অন্যরা জানতে পারেন- আসলে কার পণ্য কেমন। তা দেখে সহজেই ভাল পণ্য বাছাই করে নিতে পারেন।’

এদিকে, করোনা মহামারি শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে উদ্যোক্তা ও ডেলিভারি ম্যানদের নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে ‘রাজশাহীর উদ্যোক্তা’র অ্যাডমিন ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের লক্ষ্য এখন রাজশাহী তথা দেশে নয়, বিদেশেও কাজ করার। ফলে ‘রাজশাহীর উদ্যোক্তা’ ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন উদ্যোক্তা হতে চাওয়া ‘তরুণ-তরুণীরা’।

রাজলাইভ/এইচ.এ


  • 699
    Shares